কদম ফুলের শৈশব


লেখাঃ পাপাই সরকার


কর্মসূত্রে আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। ওপরতলা থেকে এবার নির্দেশ এল বিহারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাবার। সেই মতন বেরিয়ে পড়লুম ব্যাগ কাঁধে। ব্যাচেলর হলে যা হয় আর কি! আধা সন্ন্যাস জীবন কাটানোর মনোভাব। রাতের ট্রেন শিয়ালদাহ থেকে।


বর্ষার মরসুম, সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার দরুন চারিপাশে একটা ঠাণ্ডার রেশ রয়েছে। জুবুথুবু হয়ে বসে আছি ষ্টেশনে ট্রেন ঢোকার অপেক্ষায়। যে চেয়ারে বসে আছি তার পাশেই এক মা তার সন্তান নিয়ে নীচে শুয়ে আছেন। মা ঘুমোচ্ছে আর বছর দুয়েকের নিষ্পাপ শিশুটি অবাক চোখে রাতের ব্যস্ততায় ঘেরা মানুষগুলোকে দেখে চলেছে। বাচ্চাদের সারল্য আমাকে বরাবরই মোহিত করে। মৃদু ঠাণ্ডায় যখন আমি হাত গুটিয়ে বসে আছি তখন সে মায়ের আঁচল মুখে দিয়ে খেলতে ব্যস্ত।


ষ্টেশনে রাত কাটানো এই মানুষগুলোর জরাজীর্ণ জীবন দেখলে উপলব্ধি করতে পারি, এক ছাদের নীচে পরিবার নিয়ে থাকা সত্ত্বেও জীবন নিয়ে আমাদের অভিযোগের কোন শেষ নেই। শীর্ণকায় মা, ছেঁড়া জামা পরিহিত সন্তান, অর্ধেক খাওয়া রুটি, ক্ষুধার্ত এক বিড়াল এসব দেখতে দেখতে কখন যেন ট্রেন ঢুকল। দেরি না করে উঠে পড়লুম বাতানুকূল কামরায়। ব্যাস,এক ধাক্কায় সব জীর্ণতা কে ভুলে চেপে বসলুম বাবুর মতন। ট্রেনে-বাসে চাপলে আমার ঘুম হয়না। কোনওরকমে এপাশ ওপাশ আর আধ বোজা চোখে ক্লান্তিকে দূর করতে করতেই ভোর হয়ে গেল।


কিষাণগঞ্জ নামতেই কুলিদের কোলাহল শুরু হল। পেটের তাগিদ কতটা তীব্র তা এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে না দেখলে বোঝা যায় না। আর বোঝা যাবেই বা কিভাবে? আমাদেরসমাজে গরীবের অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করে কেউ নোবেল পেয়ে যায় কিন্তু দারিদ্রতার অন্ধকারের অন্ত হয়না। হায় রে আমার বিশ্বজগৎ। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে বাস ধরলাম। পরবর্তী গন্তব্য আড়াড়ীয়া জেলার রউটা নামক গ্রামে। যথারীতি সেখানে পৌঁছে, স্নান ও জলখাবার খেয়ে বেরলাম মূল উদ্দেশ্যে।


কোঙ্কাঈ নদীর পাশ দিয়ে চলেছি। মিষ্টি একটা বাতাস বইছে। বর্ষার দরুন জলের স্রোত বেশ তীব্র। জেলেরা জাল ফেলছে আর কিছু বক চাতকের মতন চেয়ে আছে সুযোগের সন্ধানে। নদীর বুকে সাদা বালি এক অনন্য রুপ সৃষ্টি করেছে। এমন মনোরম শোভা দেখতে দেখতে পৌঁছলুম এক গ্রামে।


গ্রামের বিভিন্ন মানুষের সাথে আলাপচারিতা শুরু হল । দূর থেকে ভেসে আসছে বাচ্চাদের কোলাহলের শব্দ। এরকমই এক পরিবারের সাথে পরিচয়ের সময় জীবনের সব থেকে বড় এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। স্বামী, স্ত্রী, ছয় সন্তান আর বৃদ্ধা মা, এই হল সেই পরিবারের বর্ণনা। কাঁচা বাড়ি, কর্তা বাইরে খাটিয়া তে বসে পান চিবচ্ছেন, বৃদ্ধা মা ভেঙ্গে নুইয়ে পড়া এক ঘরে শুয়ে। কথোপকথনের সারসংক্ষেপে যা বুঝলুম, স্ত্রী অর্থ উপার্জন করে আনেন আর তার স্বামী, ছয় সন্তান এবং শাশুড়ির মুখে অন্ন জোগান। ভদ্রলোক কাজে যান না কারণ, তার কাজ করতে ভাল লাগে না। এবং এতগুলি সন্তান হবার জন্য তিনি গর্বিত, কারণ এটাই বীরপুরুষের প্রতিক। এক মুহূর্তের জন্য ওই মহিলার কথা ভেবে শিউড়ে উঠলুম। এরপর আর কথা না বাড়ানোই শ্রেয় বলে মনে করে বেরিয়ে এলুম। কিন্তু তখনও বোধহয় অবাক হওয়ার বাকি ছিল।


ফিরতি পথে হঠাৎ কিছু বাচ্চা চোখে পড়ল। বাচ্চাগুলি একটি কদম গাছের নীচে কিছু খুঁটে খাবার চেষ্টা করছে দেখে আগ্রহ নিয়ে সেখানে গেলাম। ক্যামেরা বার করে ছবি তুলতেই তারা পালাল। পালানোর সময় হাতে কদমফুল আর নুন দেখতে পেলুম। পাশে এক মহিলা কে কদম ফুল আর নুনের বিষয়টা জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিল, ''ক্যায়া করে ভাইয়া,ভুক সে বড়কর কোই দুশমন নেহি''। আর কোন পাল্টা প্রশ্ন করতে পারিনি,শুধু সারাটা রাস্তা একটা কথাই ঘুরেছে মগজে, ''ভুক সে বড়কর কোই দুশমন নেহি''।